: হিংসা মোকাবিলায় ব্যর্থ দিল্লি পুলিশকে তিরস্কার করা এবং খোদ কেন্দ্রীয় সরকারকেই বিরূপ প্রশ্ন করে বিব্রত করার ২৪ ঘন্টার মধ্যে দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলীধরকে গতকাল মধ্যরাতের অর্ডারে বদলি করে দেওয়া হল পাঞ্জাবে। যা নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, সরকার এখন বিচারবিভাগকেও শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে। কংগ্রেসের এই অভিযোগের পালটা কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেছেন, এই বদলির নির্দেশের সঙ্গে দিল্লির হিংসা সংক্রান্ত হাইকোর্টের অবস্থানের সম্পর্ক নেই। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি কলেজিয়াম। ১২ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ওই বিচারপতির অভিমতও নেওয়া হয়েছে। সুতরাং এটা নিয়ে অযথা রাজনীতি করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত এস মুরলীধর মঙ্গলবার মধ্যরাতে বিশেষ শুনানি ডেকে দিল্লি পুলিশকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, আমাদের চোখের সামনে ১৯৮৪ সালের পুনরাবৃত্তি হতে দেব না। সেই অপরাধেই কি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল? উঠছে প্রশ্ন। এদিকে মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত দিল্লিতে। সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩৮। হাসপাতালে হাসপাতালে এখনও হাহাকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর অবশ্য এদিন দিল্লির হিংসা নিয়ে বিরোধীদের একহাত নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কারা এসব শুরু করেছিল? এসব দু’দিনে হয়নি। তাওয়া দু’মাস ধরেই গরম হচ্ছিল। নাগরিকত্ব আইন পাশের পর রামলীলায় কংগ্রেসের র্যালিতে স্লোগান উঠেছিল, হয় এপারে নাহলে ওপারে। এটা উস্কানি নয়? আপের আমানতুল্লাহ বলেছিলেন, ফেজ টুপি পরতে দেওয়া হবে না। এসব সিএএ-তে লেখা আছে?
৮৫ বছরের বৃদ্ধা আকবরী বিবির পায়ে অস্টিও আর্থারাইটিস। একদল দুষ্কৃতী মহল্লায় ঢুকে তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে পরিবারের সবাই পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেও আকবরী হাঁটতেই পারেন না, দৌঁড়নোর প্রশ্ন নেই। তাই অসহায়ের মতো জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯ বছরের বিবেক চৌধুরীর মাথায় জলের পাম্পের ধারালো ব্লেড ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে এখন মৃত্যুর দোরগোড়ায়। ব্রহ্মপুরীর নীতিন কুমার বাবাকে নিয়ে ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন। দোকান বন্ধ দেখে ফেরার পথে আচমকা দুটো মোটরবাইক পিছন থেকে ধাক্কা মেরে তাদের রাস্তায় ফেলে দিল। নীতিনের চোখের সামনে বাবাকে মাটিতে ফেলে গলায় টায়ার জড়িয়ে আগুন ধরিয়ে চেপে রাখা হয়েছিল। যতক্ষণ না মারা যান। নীতিন কুমারের চোখ আর মাথায় লোহার রড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। জিটিবি হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে সে জীবনমৃত্যুর মাঝখানে। তিনদিন ধরে ছেলে নিখোঁজ। আজ মহসিন আলির মৃতদেহ এলএনজেপি হাসপাতালে খুঁজে পেলেন তার বাবা মা। দু’মাস আগে বিয়ে হয়েছিল ছেলের। ভাইয়ের জন্য খেলনা কিনতে চাঁদনী চকে গিয়েছিল সে। সেখান থেকে ফেরার পথেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। কেউ দিনমজুর, কেউ সব্জি বিক্রেতা, কেউ প্লাম্বিং এর কাজ করত, কেউ সামান্য অর্ডার সাপ্লায়ার্স। উত্তর-পূর্ব দিল্লির জনপদের পর জনপদ এখন মৃত্যুপুরী। প্রত্যেক নিহত ব্যক্তি একেবারেই সাধারণ নিরীহ মানুষ। পক্ষান্তরে দুষ্কৃতীরা এলাকায় এলাকায় গণহত্যা চালিয়ে অবাধে দাপিয়ে বেরিয়েছে।
দিল্লির হিংসা বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে রাখতে মুখ খুলেছে বিজেপির জোট শরিকরা। অকালি দল এমপি নরেশ গুজরাল কেন্দ্রকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে বলেছেন, আমি নিজেই পুলিশকে ফোন করে বলেছি, আমাকে ১৫ জন পরিচিত মুসলিম পরিবার ফোন করে প্রাণরক্ষা করতে বলেছে। ফোন করেও কোনও লাভ হয়নি। রামবিলাস পাসোয়ানের পুত্র এনডিএ জোটশরিক নেতা চিরাগ পাসোয়ান বলেছেন, বিজেপির উচিত সেইসব নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যারা, এই আগুন ছড়িয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৮টি এফআইআর হয়েছে। ১৬৬ জন গ্রেপ্তার। কিন্তু গোটা উত্তর-পূর্ব দিল্লি তো বটেই, দিল্লি জুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ অব্যাহত। আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছে দু’টি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) গঠন করা হয়েছে। তারাই তদন্ত করবে। এদিকে সরকারিভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলার পাশাপাশি নিখোঁজ বহু। কোথায় গেল তারা? দিল্লির হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল, থানা থেকে থানায় ঘুরছে পরিবারবর্গ স্বজনের খোঁজে।