বিয়ের নামে গরিব আদিবাসী ঘরের মহিলাদের ধর্মান্তকরণের চেষ্টা রোখার সঙ্গেই সামাজিক দায়বদ্ধতাও মেটাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা-মাটি-মানুষ সরকার। মালদহের বিভিন্ন প্রান্তের ৩০০ আদিবাসী মহিলার বিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সম্পন্ন হল গাজোলের কলেজ ময়দানে। মালদহ জেলা পুলিসের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় ’গণবিবাহ’-এর আয়োজন সারা হল আদিবাসী রীতি আর প্রথা মেনে। চলতি মাসেই উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের চা-বাগান এলাকাতেও এহেন আদিবাসী গণবিবাহের উদ্যোগ রূপায়িত হবে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে।
এই বিয়ের জন্য আদিবাসী মহিলারা সরকারের তরফে যেমন পেলেন রূপশ্রী প্রকল্পের আর্থিক আনুকূল্য, তেমনই আবার নব দম্পতিকে আশীর্বাদের সঙ্গেই উপহার স্বরূপ মুখ্যমন্ত্রী তুলে দিলেন শাড়ি, ধুতি আর নতুন সংসারের প্রয়োজনীয় বাসনপত্র। ঘুরে ঘুরে তদারকি করলেন বিয়ের আয়োজনের। খোঁজ নিলেন বর আর কনেযাত্রীদের ভোজের আয়োজনের বিষয়েও। অভিভূত, আপ্লুত আদিবাসী মেয়েদের অনুরোধে ধামসা-মাদলের বোলে নাচের সঙ্গে পা মেলালেন মমতা। কবিতা লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন, গান লিখে তাতেও সুরও করেছেন বিস্তর। কিন্তু আদিবাসী মেয়েদের সঙ্গে কোমর দোলাচ্ছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান, বিরল সেই দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করতে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় চিত্রসাংবাদিকদের মধ্যে। মুখ্যমন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনির মাঝে তখন বারবার শোনা যাচ্ছিল জয় জোহার, জয় জোহার রব। মঞ্চ থেকে মমতা জানিয়ে দিলেন, আদিবাসী মানুষের বসবাস রয়েছে, এমন সব জেলায় এবার থেকে সরকারি উদ্যোগে গণবিবাহের আয়োজন করা হবে। যে পরিবার তাদের কন্যার বিবাহের জন্য সাহায্য চাইবে, সরকার পাশে দাঁড়াবে। বছরে ১০ হাজার আদিবাসী মেয়ের বিয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা। সেই সঙ্গে দৃপ্ত কণ্ঠে জানিয়ে দেন, আদিবাসীদের জঙ্গল ও জমির অধিকার সুরক্ষিত করতে কড়া আইন এনেছে তাঁর সরকার। এরই সঙ্গে আদিবাসী সমাজের ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের সদ্য ঘোষিত পেনশন স্কিম ‘বন্ধু’তে নাম নথিভুক্ত করার আহ্বানও জানান তিনি। আগামী পয়লা এপ্রিল থেকে এই পেনশন স্কিমে আদিবাসী প্রবীণ নাগরিকরা এক হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য পাবেন।
গত লোকসভা নির্বাচনে মালদহ জেলার আদিবাসী প্রভাবিত ওল্ড মালদহ, গাজোল, হরিশচন্দ্রপুর, হবিবপুর, মালতীপুর ও বামনগোলার মতো অংশে নিজেদের অস্তিত্ব অনেকটাই জাহির করতে সক্ষম হয়েছিল পদ্মশিবির। অভিযোগ, আদিবাসী সমর্থন আদায়-পরবর্তী পর্বে নিজেদের ‘এজেন্ডা’ পূরণে নেমে পড়ে গেরুয়া শিবির। গত ২ ফেব্রুয়ারি ওল্ড মালদহের ভাবুক এলাকার আট মাইলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের গণবিবাহের আয়োজন করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। গণবিবাহের নামে আদিবাসীদের ধর্মান্তকরণ করা হচ্ছে, এই অভিযোগ তুলে জাতীয় সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিবাহস্থলে হামলাও চালানো হয়। ভিএইচপি সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষও হয় আদিবাসীদের। পুলিস পৌঁছে বন্ধ করে সেই অনুষ্ঠান। বিষয়টি নজরে আসার পরেই মমতা বলেছিলেন, গরিব ঘরের আদিবাসী মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নেবে সরকার। রূপশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে দেওয়া হবে বিবাহযোগ্যাদের আর্থিক সাহায্য। কিন্তু কোনওভাবেই আদিবাসী রীতি ও প্রথার পরিপন্থী কোনও কর্মসূচি রূপায়ণ করতে দেওয়া হবে না কোনও সংগঠনকে। সেই ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যে আদিবাসী রীতি মেনে গণবিবাহের আয়োজনকে সম্পন্ন করে কথা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী। কৃতজ্ঞচিত্তে মমতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন দশরথপুরের শেফালি মাণ্ডি, হবিবপুরের সীমান হেমব্রম, মালতীপুরের উর্মিলা কিস্কু, বামনগোলার নন্দিতা সোরেন আর ওল্ড মালদহের নন্দিতা কিস্কুর মতো আরও অনেক সদ্য বিবাহিতা।