বাজেটে ব্যাঙ্ক ডিপোজিট ইনসিওরেন্সের অঙ্ক ১ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লক্ষ টাকা ঘোষণার এক মাসের মধ্যেই দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায় ইয়েস ব্যাঙ্ক। আর এই নিয়ে দেশের তামাম ব্যাঙ্ক গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে শুক্রবার তড়িঘড়ি ময়দানে নামতে হয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে। বিবৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনও চিন্তা নেই। ইয়েস ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের জমা অর্থ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আপনাদের টাকা নিরাপদই রয়েছে।’ অর্থমন্ত্রীর আরও প্রতিশ্রুতি, ‘ব্যাঙ্কের কোনও গ্রাহকের টাকা মার যাবে না। নিশ্চিন্ত থাকুন।’ অর্থমন্ত্রীর এই বিবৃতির পাশাপাশি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্য দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হবে। এর জন্য ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। দেশের ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র সুরক্ষিত ও মজবুত। আমরা আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বৃহস্পতিবারই ইয়েস ব্যাঙ্কের আর্থিক ভাণ্ডার ৮৫ শতাংশ ধসে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নির্দেশ দেয় ইয়েস ব্যাঙ্কের গ্রাহকরা তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে ৫০ হাজার টাকার বেশি তুলতে পারবেন না। ইয়েস ব্যাঙ্কের পরিচালন বোর্ডকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়। আপাতত আরবিআই নির্দিষ্ট প্রশাসক ইয়েস ব্যাঙ্ক প্রশাসন পর্যালোচনা করবেন। এরপরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ৬ মাসের ব্যবধানে দুটি ব্যাঙ্ক প্রায় দেউলিয়া হওয়ার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত বছর মহারাষ্ট্রের পিএমসি ব্যাঙ্ক এভাবেই ধস নেমেছিল। কারণ বিপুল অঙ্কের অর্থ নয়ছয়। আর মাত্র এক মাস পর পয়লা এপ্রিল একঝাঁক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মধ্যে সংযুক্তিকরণ ঘটছে। বস্তুত ভারতের ব্যাঙ্কিং সেক্টর প্রবল এক আর্থিক টালমাটালের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত বছরের প্রথম তিনটি ত্রৈমাসেই দেখা গিয়েছে, প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লোকসান হয়েছে। ইয়েস ব্যাঙ্কের এই ঘটনা নিয়ে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম এদিন বলেন, ‘বিগত ৬ বছরে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আর্থিক পরিচালন ব্যবস্থায় তারা যে কতটা ব্যর্থ তা বারংবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে পিএমসি ব্যাঙ্ক। এবার ইয়েস ব্যাঙ্ক। সরকার কি আদৌ এ নিয়ে চিন্তিত? সরকার কি নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে পারে? এই লাইনে কি তৃতীয় ব্যাঙ্কটিও রয়েছে?’ শুধু চিদম্বরম নয়, ইয়েস ব্যাঙ্ক নিয়ে মোদি সরকারকে এক হাত নিয়েছেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও। ট্যুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘নো ইয়েস ব্যাঙ্ক। প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তাঁর চিন্তাভাবনাগুলিই ভারতের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’
এদিকে ইয়েস ব্যাঙ্কের এই আচমকা ধসে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে চর্চা হচ্ছে সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট ঘোষণার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও। এতদিন পর্যন্ত ব্যাঙ্কে জমা টাকার উপর এক লক্ষ টাকার বিমা ছিল। অর্থাৎ, যদি কোনও কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে যেত, তাহলে গ্রাহক যত টাকাই রেখে থাকুন না কেন, বিমার রাশি হিসেবে ১ লক্ষ টাকাই পাওয়ার নিয়ম ছিল। ডিপোজিট ইনসিওরেন্স অ্যান্ড ক্রেডিট গ্যারান্টি কর্পোরেশনের
মাধ্যমে এই বিমার ব্যবস্থা করা হয়। গত মাসের বাজেটে সেই বিমা অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয় ৫ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ যত টাকাই ব্যাঙ্কে সেভিংস, কারেন্ট বা ফিক্সড ডিপোজিট হিসাবে
থাকুক, ব্যাঙ্কের আর্থিক ভরাডুবির জেরে গ্রাহক পাবে ৫ লক্ষ টাকাই। বাজেটের ওই ঘোষণার এক মাসের মধ্যেই ইয়েস ব্যাঙ্কের এই ধস দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চিন্তার কারণ নেই। ব্যাঙ্কে থাকা টাকা নিরাপদ।