অবসরের মাত্র চার মাসের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকে আগামী ছ’বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য করার সিদ্ধান্তে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল। প্রধান বিচারপতি থাকাকালীনই রাফাল যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে রাজনৈতিকভাবে হাইভোল্টেজ রাম জন্মভূমির মতো বিতর্কিত মামলার রায় দিয়েছেন রঞ্জন গগৈ। ঘটনাচক্রে যা মোদি সরকারের পক্ষেই গিয়েছে। তাই ওয়াকিবহাল মহলে বিষয়টি নিয়ে প্রবল চর্চা শুরু হয়েছে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রাজ্যসভার সদস্য হলেও কেউ মনোনীত সদস্য হয়ে সংসদের উচ্চকক্ষে আসেননি। এ ব্যাপারে রঞ্জন গগৈই প্রথম। তাই নজিরবিহীন এই ঘটনায় মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ চড়াল কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম সহ বিরোধী দলগুলি। সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রঞ্জন গগৈ যেদিন রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, সেদিন সম্মিলিত বিরোধীরা ‘ওয়াক আউট’ করবে বলেই ঠিক করেছে।
মুখ খুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিরাও। মদন বি লকুর, ক্যুরিয়ন জোসেফের মতো সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিরা অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মদন লকুরের মন্তব্য, বিচার ব্যবস্থায় মানুষের যে আস্থা রয়েছে, তার উপর এটি বড় আঘাত। রঞ্জন গগৈয়ের এই পদ গ্রহণ করা উচিত নয়। ক্যুরিয়ন জোসেফ বলেছেন, রঞ্জন গগৈয়ের রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার ফলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, অখণ্ডতা এবং স্বাধীনতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে। তাই সুপ্রিম কোর্টের আর এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস ঠাকুর যেভাবে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার ইস্যুতে আম আদমি পার্টির প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, রঞ্জন গগৈয়েরও তাই করা উচিত ছিল বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল। যদিও খোদ রঞ্জন গগৈ সংবাদ সংস্থাকে জানিয়ে দিয়েছেন, আগে শপথ নিই। তারপর সকলকে বুঝিয়ে দেব, কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করলাম।
১৩ মাস দেশের প্রধান বিচারপতি থাকার পর গত ১৭ নভেম্বর অবসর নেন রঞ্জন গগৈ। তাই অবসরের রেশ কাটতে না কাটতেই নজিরবিহীনভাবে তাঁকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য করায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূলের আইনজীবী এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার বাইরে তো বটেই, সভার মধ্যেই এ নিয়ে মুখ খোলেন। বলেন, এটি সরকারের নিলর্জ্জ সিদ্ধান্ত। জাতির লজ্জা। বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত হল আস্থা। আত্মবিশ্বাস। রঞ্জন গগৈয়ের এমপি হওয়ার ফলে সেই ভিত নড়ে গেল। দলের আর এক এমপি সৌগত রায় বলেন, সরকার প্রস্তাব দিলেও রঞ্জন গগৈয়ের তা প্রত্যাখান করা উচিত ছিল। তা না হওয়ায় তিনি সম্প্রতি সেসব রায় দিয়েছেন, সেসবের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। তবে কি সরকারের সঙ্গে কোনও গোপন বোঝাপড়া ছিল? তৈরি হচ্ছে জল্পনা।
কংগ্রেসের লোকসভার নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেন, দেশ যে কী ভয়ঙ্কর দিকে যাচ্ছে, রঞ্জন গগৈকে এমপি করার এই সিদ্ধান্তই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিচারব্যবস্থা নিয়েই তো জনমানসে সন্দেহ তৈরি হবে। কংগ্রেস মুখপাত্র তথা রাজ্যসভার আইনজীবী এমপি অভিষেক মনু সিংভি বিষয়টিকে অত্যন্ত সিরিয়াস এবং চিন্তার বলেই বর্ণনা করেন। বলেন, এর আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঙ্গনাথ মিশ্র রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন বটে, তবে অবসরের ছ’ বছর পর ওড়িশা থেকে জিতে এসেছিলেন। রঞ্জন গগৈয়ের মতো মনোনীত নয়।
বাহারুল ইসলামও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। তবে রাজ্যসভা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বিচারপতি হয়েছিলেন। তাই রঞ্জন গগৈকে এমপি করার এই সিদ্ধান্ত কেবল নজিরবিহীন নয়, নিন্দনীয়। সমালোচনা করেছে সিপিএমও। দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, রঞ্জন গগৈই একটা সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের পর বিভিন্ন পদে যাওয়ার ব্যাপারে সমালোচনা করেছিলেন, আর আজ তিনি নিজে কী করছেন?